মুসলিম উম্মাহর সর্ববৃহৎ ধর্মীয় একটি উৎসব ঈদুল আজহা।ইব্রাহিম আলাইহি সালামের আত্বত্যাগের স্মৃতিচিহ্ন ইদুল আযহাকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে খুশির আমেজ। আল্লাহর সন্তুষ্ঠির লক্ষে জবাই করা হয় লাখ লাখ কুরবানির পশু।কুরবানির পশুর গোশত নিজে ভক্ষন করার পাশাপাশি বিলিয়ে দেওয়া হয় অসহায়দের মাঝে।বিলিয়ে দেওয়ার নানা নিয়মও রয়েছে আমাদের সমাজে।তবে কোরাআন হাদিসের আলোকে সঠিক নিয়ম কি?বিস্তারিত জানতে আমাদের সঙ্গেই থাকুন শেষ পর্যন্ত।কোরআন হাদিসের আলোকে কুরবানীর গোশত বন্টন
কোরআনের আলোকে কুরবানির গোশত বন্টন
১. সূরা আল-হাজ্জ (২২:৩৬)
فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ
বাংলা অনুবাদ:
“সুতরাং তোমরা তা থেকে খাও এবং মিসকিন অভাবগ্রস্তকে খাওয়াও।”
ব্যাখ্যা:
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা কুরবানির পশু জবাই করার পর দুইটি নির্দেশ দিয়েছেন—
১. নিজে খাও
২. গরিবদের খাওয়াও (সদকা করো)
২. সূরা আল-হাজ্জ (২২:২৮)
لِيَشْهَدُوا مَنَافِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَعْلُومَاتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ
বাংলা অনুবাদ:
“যেন তারা তাদের উপকার লাভ করে এবং নির্ধারিত দিনে আল্লাহর নাম স্মরণ করে সেই পশুর ওপর যা তিনি তাদেরকে দিয়েছেন। অতঃপর তা থেকে খাও এবং মিসকিন অভাবগ্রস্তকে খাওয়াও।”
ব্যাখ্যা:
এখানেও আবার একই কথা বলা হয়েছে:
- কুরবানির পশু আল্লাহর পক্ষ থেকে রিজিক
- তা থেকে খাও
- গরিবদের খাওয়াও
হাদিসের আলোকে কুরবানির গোশত বন্টন:
১. বুখারী, হাদীস নং: ৫৫৪৯
عَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ قَالَ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:
«كُلُوا وَادَّخِرُوا وَتَصَدَّقُوا»
বাংলা অনুবাদ:
সালামা ইবনুল আকওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাঃ) বলেন:“তোমরা (কুরবানির গোশত) খাও, সংরক্ষণ কর এবং সদকা কর।”
২. মুসলিম, হাদীস নং: ১৯৭১
عَنْ سَلَمَةَ بْنِ الْأَكْوَعِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:
«كُلُوا وَأَطْعِمُوا وَادَّخِرُوا»
বাংলা অনুবাদ:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:“তোমরা (কুরবানির গোশত) খাও, খাওয়াও এবং সংরক্ষণ কর।”
৩. মুসলিম, হাদীস নং: ১৯৭৪
عَنْ نَافِعٍ، عَنْ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:
«كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ لُحُومِ الأَضَاحِيِّ أَنْ تَأْكُلُوهَا فَوْقَ ثَلاَثٍ، فَأَمْسِكُوا مَا بَدَا لَكُمْ»
বাংলা অনুবাদ:
ইবনে উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন:“আমি তোমাদেরকে কুরবানির গোশত তিন দিনের বেশি খাওয়ার ব্যাপারে নিষেধ করেছিলাম, এখন ইচ্ছেমতো রেখে দিতে পারো।”
৪. বায়হাকি (السُّننُ الكُبْرَى), হাদীস নং: ১৯০৬৫
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ:
«كَانَ النَّاسُ يَجْعَلُونَ مِنْ أُضْحِيَتِهِمْ ثَلَاثَةَ أَثْلَاثٍ، ثُلُثًا لأَهْلِهِ، وَثُلُثًا لِلْمَسَاكِينِ، وَثُلُثًا لِمَنْ سَأَلَ»
বাংলা অনুবাদ:
ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন:“মানুষরা তাদের কুরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করত—এক ভাগ পরিবারের জন্য, এক ভাগ মিসকিনদের জন্য এবং এক ভাগ যারা চাইত তাদের জন্য।”
উপরোক্ত কোরআন ও হাদিসের বক্তব্য থেকে সুস্পষ্ট হল কুরবানীর গোশত নিজে ভক্ষন করার পাশাপাশি অসহায়দের দিতে হবে
কুরবানির গোশত বন্টনের ব্যাপারে সাহাবিদের আমল
আরবি:
عن ابن عباس رضي الله عنه قال: كان المسلمون يجمعون في أضحيتهم ثلاثة أثلاث: ثلثاً لأهلهم، وثلثاً لفقرائهم، وثلثاً لمن سألهم.
السنن الكبرى للبيهقي (19065)
বাংলা অনুবাদ:
ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন: মুসলিমরা তাদের কুরবানির গোশতকে তিন ভাগে ভাগ করতেন—এক ভাগ পরিবারের জন্য, এক ভাগ গরিবদের জন্য, এবং এক ভাগ যারা চায় তাদের জন্য।
মূল বক্তব্য:
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, সাহাবীগণ তিন ভাগে বণ্টন করাকেই পছন্দনীয় মনে করতেন এবং তা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগ থেকেই প্রচলিত ছিল।
ইমাম মালিক বলেন:
“لا بأس أن يأكل الإنسان من أضحيته، ويطعم، ويدخر.”
(আল-মুয়াত্তা, باب الضحايا)
বাংলা অনুবাদ:কোনো দোষ নেই যে মানুষ তার কুরবানির গোশত থেকে খাবে, খাওয়াবে এবং সংরক্ষণ করবে।
কুরবানির গোশত বন্টনে ফকিহদের অভিমত কি?
কুরবানির গোশত কীভাবে বণ্টন করতে হবে? একা খাওয়া যাবে কি? সবটা দান করা যাবে কি? তিন ভাগে ভাগ করাটা কী ফরজ, সুন্নত, না মুস্তাহাব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে ফকিহরা যা বলেছেন।
১. হানাফি মাযহাব
মূল অভিমত:
তিন ভাগে বণ্টন করা মুস্তাহাব (উত্তম), পুরোটা নিজে খেলে মাকরুহে তাহরীমি (হারামের কাছাকাছি)।গরিবদের দেওয়া জরুরি বিশেষ করে নফল কুরবানীতে
ويستحب أن يقسم لحم الأضحية أثلاثاً، فيأكل ثلثاً، ويتصدق بثلث، ويهدي ثلثاً.
(الدر المختار مع رد المحتار 6/326)
বাংলা অনুবাদ: কুরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব: এক ভাগ খাবে, এক ভাগ সদকা করবে, আর এক ভাগ উপহার দিবে।
২. মালেকি মাযহাব
মূল অভিমত:
গোশত খাওয়া, দান করা ও সংরক্ষণ করা – সবই বৈধ। তবে গরিবদের দেওয়া উত্তম।তিন ভাগে বণ্টনের নির্দিষ্ট নিয়ম নেই, তবে তা করা নেক কাজ।
ويجوز أكل لحم الأضحية، والادخار منها، والإطعام منها، ولا يُكرَه شيء من ذلك.
(الشرح الكبير للدردير، 2/134)
বাংলা অনুবাদ: কুরবানির গোশত খাওয়া, সংরক্ষণ ও খাওয়ানো—সবই বৈধ। এর কিছুই অপছন্দনীয় নয়।
৩. শাফেয়ি মাযহাব
মূল অভিমত:
সুন্নত কুরবানির গোশত থেকে কিছু খাওয়া মুস্তাহাব, এবং গরিবদের দান করা ও উপহার দেওয়া উত্তম।সদকা না করলে কুরবানির উদ্দেশ্য অপূর্ণ থাকে।
يُسن أن يأكل منها، ويتصدق، ويهدي، فإن أكل الجميع أو تصدق بالجميع جاز.
(المجموع شرح المهذب 8/418)
বাংলা অনুবাদ:কুরবানির গোশত থেকে খাওয়া, সদকা ও উপহার দেওয়া সুন্নত। কেউ সবটা খেলে বা দান করলেও তা বৈধ।
৪. হাম্বলি মাযহাব
মূল অভিমত
গোশত তিন ভাগে ভাগ করা সুন্নত: এক ভাগ খাবে, এক ভাগ উপহার দেবে, এক ভাগ গরিবদের দেবে।
والمستحب أن يأكل ثلثها، ويهدي ثلثها، ويتصدق بثلثها.
(الإنصاف للمرداوي 4/109)
বাংলা অনুবাদ:উত্তম হচ্ছে, কুরবানির গোশতের এক-তৃতীয়াংশ খাওয়া, এক-তৃতীয়াংশ উপহার দেওয়া এবং এক-তৃতীয়াংশ গরিবের দেওয়া উত্তম
অতএব, কুরবানির গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রে উত্তম পদ্ধতি হলো—তিন ভাগে ভাগ করা: এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয় ও বন্ধুদের জন্য এবং এক ভাগ দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা। এটি কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা, সাহাবিদের আমল এবং ফকিহদের অভিমতের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। কুরবানি শুধুই একটি পশু জবাইয়ের নাম নয়; এটি হলো তাকওয়া, ত্যাগ ও মানবতার এক অনুপম প্রকাশ। আসুন, আমরা কুরবানির প্রকৃত চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গোশতের সঠিক বণ্টনের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য সমাজে ছড়িয়ে দিই।আরও জানুন বাংলাদেশের সর্বপ্রথম ইসলাম কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?

